দার্জিলিং জমজমাট
সিটং এ রিষান কটেজে যখন পৌঁছালাম তখন দুপুর হয়ে গিয়েছে l গাড়ি থেকে নেমে হোমস্টে টা দেখেই মন টা ভালো হয়ে গেলো l বাইরে থেকে কটেজ গুলির প্রথম দর্শন প্রেমে ফেলে দিলো l সামনের দিকে নানা রং বেরঙের ফুল গাছে শোভা পাচ্ছে নানান ফুল l এদিকে পেটে ছুঁচো ডন মারছে l তাই তাড়াতাড়ি রিষান কটেজ এর রিসাপশন এ ( একটা ছোট্ট সুন্দর অফিস ) যাবতীয় ফর্মালিটিস পূরণ করে আমাদের রুমে চলে গেলাম l রুমের দরজা খুলে মন টা খুশি হয়ে গেলো l বড় সড় রুমে দুটা বেড l খুবই সুন্দর সাজানো গোছানো l
ব্যাগপত্র রেখে, কাপড় ছেড়ে সোজা বাথরুমে গিয়ে স্নান সেরে ফেললাম l ফ্রেশ হয়ে চলে গেলাম ক্যান্টিনে l একদম ঘরের মতো পরিবেশ আর ঘরোয়া খাবার দেখে মন টা আরো ভালো হয়ে গেলো l স্টাফ দের ব্যবহার অত্যন্ত ভালোl আমাদের দুপুরের লাঞ্চে পাতে পড়লো সরু চালের সাদা ভাত, মুগ ডাল, মিক্স ভেজ, রুই মাছের ঝাল, বেগুন এর পকোড়া, স্যালাড, পাঁপড় আর আঁচার l রান্নার স্বাদ নিয়ে কোনো কথা হবেনা l খুবই সুস্বাদু আর একদম বাড়ির খাবারের মতো l ঠান্ডার কারণে গরম জলও দিয়েছিলো খাওয়ার জন্য l
সিটং জায়গাটা নিয়ে দু চার কথা বলি l
আমরা বাঙালিরা পাহাড় ভ্রমণ বলতে প্রথমেই দার্জিলিং এর কথা ভাবি l আর দার্জিলিং শহর কেন্দ্রিক ট্যুর করে থাকি l কিন্ত যুগ বদলাচ্ছে l এখন মানুষ একটু অফবিট জায়গায় দু এক রাত কাটিয়ে আসতে চাইছে l দার্জিলিং এর মধ্যেই এমনই এক মন ভোলানো কাঞ্চনজঙ্ঘা আর পাহাড়ের সব রকম শোভার ডালি সাজিয়ে সদা প্রস্তুত সিটং l কার্শিয়াং সাবডিভিশন এর অন্তর্গত এই সিটং আসলে একটি খাস মহল l শীতকালে হিমেল বাতাস, মিঠে রোদ আর কমলালেবুর পসরা সাজিয়ে সিটং সবাই কে স্বাগত জানায় l জানা অজানা হাজার ফুলের ভিড় চারদিকে l সিটং কে অনেকে কমলালেবুর দেশও বলে l সারাবছরই এখন এখানে পর্যটকদের আনাগোনা হলেও অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত সিটংএর মানুষজন, হোমস্টে আর প্রকৃতি যেন নতুন উদ্যোমে অপেক্ষা করে থাকে প্রকৃতি প্রেমিক পর্যটকদের আগমনের আশায় l গতানুগতিক গন্তব্যের বাইরে বেরিয়ে একটু অন্য রকম স্বাদ নিতে, নিরিবিলি তে কটা দিন কাটাতে সিটং একটা আদর্শ জায়গা l
দার্জিলিং এর পার্বত্য নদী রিয়াং এর অববাহিকায় গড়ে উঠেছে ছবির মতো সুন্দর এই সিটং গ্রাম l শিলিগুড়ি থেকে প্রায় ৫০কিমি, মঙপু থেকে ৮ কিমি আর মহানন্দা অভয়ারণ্য থেকে মাত্র ১৩ কিমি দূরত্বে এই সিটং l দার্জিলিং এর পার্বত্য অঞ্চলের পূর্ব দিকে সমুদ্রতল থেকে চার হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই সিটং গ্রাম তরাই অঞ্চলের অংশবিশেষ l এই গ্রামকে চারদিকে ঘিরে আছে কার্শিয়াং, কালিম্পঙ, সিকিম ও ভুটান l এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ মনে রাখার মতো l
সিটং গ্রামের নিজস্ব সেরকম কোনো ইতিহাস না থাকলেও এর সাথে জড়িয়ে আছে মঙপু শহরের ইতিহাস আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি l আছে শতাব্দীপ্রাচীন গুম্ফা আর এক প্রাচীন গির্জা l
দার্জিলিং চা আর কমলালেবুর জন্য জগৎবিখ্যাত আমরা সবাই জানি l কিন্ত এই কমলালেবুর সিংভাগই উৎপাদিত হয় এই সিটং এ l শীত কাল মানেই সিটংয়ের বাগানে বাগানে কমলালেবুর বাহার l পাকা কমলালেবুর গন্ধ বাতাসে ভেসে বেড়ায় l আর সেই গন্ধ মেখে নিরিবিলিতে কয়েকটা দিন কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ দেখতে দেখতে কাটিয়ে দেওয়া যায় l সিটং যেন শিল্পীর হাতে আঁকা কোনো ছবি l এতটাই সুন্দর এই গ্রাম l কমলালেবুর বাগান আর কাঞ্চনজঙ্ঘা আর এখানকার হোমস্টে গুলোর আন্তরিকতা সিটং এর প্রেমে ফেলবেই